জনগণের জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং দেশে ধাপে ধাপে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পর সরকার সর্বশক্তি দিয়ে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ফেনীর পরশুরাম উপজেলার খেয়াঘাট-মুহুরী সেতু এলাকায় মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প পুনর্বাসনের প্রথম পর্যায়ের কাজ উদ্বোধন শেষে আয়োজিত জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে আইনের শাসনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়ে পর্যায়ক্রমে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়। একই সঙ্গে তিনি সাম্প্রতিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষ যেন দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হলে সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হবে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। জনগণের কল্যাণে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল ও নদী পুনঃখনন, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মিল-কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিকভাবে পরিবারগুলোকে আরও স্বাবলম্বী করা।
স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন না হলে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে চিকিৎসার জন্য জেলা শহর কিংবা রাজধানীমুখী হতে হবে না। উপজেলা পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তিনি জানান, সম্প্রসারিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ডায়ালাইসিসসহ মা ও শিশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হবে। অতিরিক্ত ১০০টি শয্যা যুক্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বিভাগ চালুর উদ্যোগও নেওয়া হবে।
পরশুরামের ৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালটির প্রাথমিক ৩০টি শয্যা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় স্থাপন করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে তা ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। স্থানীয়ভাবে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি উঠলেও তিনি সেটিকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মধ্যম আয়ের কৃষকদের সরাসরি সরকারি সহায়তার আওতায় আনতে কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি। এর মাধ্যমে কৃষকদের সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। কৃষিঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ ইতোমধ্যে মওকুফ করা হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম সপ্তাহেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। এতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রায় ১৩ লাখ কৃষক এর সুবিধা পেয়েছেন বলে জানান তিনি। মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৃহত্তর খাল ও নদী পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় মুহুরী ও কহুয়া নদীর সংযোগকারী খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সময় ফেনীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছিল। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ মানুষের পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করার লক্ষ্যেই এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মুহুরী-কহুয়া প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকার প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হবে এবং কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা; এর আওতায় বাঁধ পুনর্বাসন, নদীতীর সংরক্ষণ, নদী ও জলাধার পুনঃখনন এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন কাজ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে কৃষকরা সরাসরি লাভবান হবেন এবং দেশে খাদ্যশস্যের সরবরাহ বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্যের দাম রাখার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মিল-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চালু হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারের কর্মসূচির মধ্যে বেকার জনগোষ্ঠী, নারী, কৃষক, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটের ভিত্তিতেই সরকার ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিএনপির ঘোষিত কর্মসূচিগুলো এখন জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এগুলো বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন।
প্রধানমন্ত্রী দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন ও সজাগ থাকার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশবাসীর দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। পরে খেয়াঘাট-মুহুরী সেতু এলাকায় গাছের চারা রোপণ এবং মাটি কেটে খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু অপসারণ, নদী খনন ও বাঁধ নির্মাণকাজেরও উদ্বোধন করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী এবং ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আউয়াল মিন্টু, পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সী রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন, সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।