শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
শিরোনাম
গুপ্ত বাহিনী’ ও ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার হাত মিলিয়ে দেশে অরাজকতার চেষ্টা চালাচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী সরকার সর্বশক্তি দিয়ে দেশে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ জিয়ার আদর্শ ও গণতন্ত্র শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত। দৈনিক ফলাফলের ৩০ বছর পূর্তি উদযাপনে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষগুলোও উন্নয়নের সুফল পায় : শেখ মোস্তাফিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতিসংঘে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদলকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে লায়ন খান আকতারুজ্জামানের সৌজন্য সাক্ষাৎ আশুলিয়ায় সাংবাদিকের ওপর সন্ত্রাসী হামলা  টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বার্থ সংরক্ষণে জাতীয় পর্যায়ে কৃষকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন গড়ে তোলার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

রাজনৈতিক অস্থিরতায় সাংবাদিকদের অস্থিরতা বেড়েছে

আওরঙ্গজেব কামাল : / ২২ টাইম ভিউ
আপডেট : শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩১ পূর্বাহ্ন

দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে পাল্লা দিয়ে  সাংবাদিকতাই অস্থিরতা বেড়েছে। প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে সংগঠন, প্রেসক্লাব গুলো কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হচ্ছে, নতুন নতুন অনলাইন মিডিয়া তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে চলছে রাজনীতির দলের  বিভাজনের সাংবাদিকতা। এখন প্রশ্ন হল সাংবাদিকতা কতটুকু বেড়েছে।বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই নানা টানাপোড়েন, সংঘাত ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হলেও সাংবাদিকতার অঙ্গনে সেই প্রত্যাশার পাশাপাশি নতুন কিছু সংকটও দৃশ্যমান হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের সুযোগ কিছুটা বিস্তৃত হলেও সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সংগঠনকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব এবং পেশাগত পরিচয়ের অপব্যবহার সাংবাদিকতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়—রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাংবাদিকতার অস্থিরতাও যেন বাড়ছে। দেশে একের পর এক সাংবাদিক সংগঠন গড়ে উঠছে, নতুন নতুন কমিটি হচ্ছে, একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক নেতৃত্বের দাবি দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন প্রেসক্লাবও নানা বিভাজনে জর্জরিত। কোথাও নেতৃত্বের বিরোধ, কোথাও সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও কমিটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি। ফলে সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য—সত্য অনুসন্ধান ও জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ—অনেক সময় পিছনে পড়ে যাচ্ছে।
আরও দুঃখজনক হলো, সাংবাদিকরাই যখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন প্রকৃত সাংবাদিকরা পড়েন বিপাকে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ বলছে, অন্য পক্ষ পাল্টা অভিযোগ করছে। কেউ সংগঠনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, কেউ কমিটির বৈধতা নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে একে অপরকে হেয় করার প্রতিযোগিতা। এই পরিস্থিতি শুধু সাংবাদিকদের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করছে না; এর সুযোগ নিচ্ছে প্রশাসনের অসাধু অংশ, রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল এবং বিভিন্ন অপরাধীচক্র।
সাংবাদিকতার ইতিহাসে মতের পার্থক্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু মতের পার্থক্য যখন পেশাগত শত্রুতায় রূপ নেয়, তখন তার ক্ষতি পুরো সাংবাদিক সমাজকে বহন করতে হয়। একজন সাংবাদিকের সঙ্গে আরেকজন সাংবাদিকের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক মতের অমিল থাকতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকের ওপর হামলা, হয়রানি, মামলা, হুমকি কিংবা পেশাগত অধিকার হরণের প্রশ্নে সাংবাদিক সমাজের ন্যূনতম ঐক্য থাকা জরুরি।
আজ একটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—দেশে সাংবাদিকের সংখ্যা কি বাড়ছে, নাকি সাংবাদিকতার মানও বাড়ছে?
সাংবাদিকতার পরিচয় এখন অনেকের কাছে যেন একটি পদবি মাত্র। কেউ সম্পাদক, কেউ প্রধান সম্পাদক, কেউ নির্বাহী সম্পাদক, কেউ বিশেষ প্রতিনিধি, কেউ আবার নিজেকে ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পদগুলোর পেছনে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, সংবাদ যাচাইয়ের দক্ষতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা কতটা আছে?
একটি পরিচয়পত্র হাতে থাকা, একটি অনলাইন পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত থাকা কিংবা কোনো সাংবাদিক সংগঠনের একটি পদে থাকা—এসবের কোনোটিই একা একজন সাংবাদিকের পেশাগত মান নির্ধারণ করতে পারে না। সাংবাদিকতার প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় তার কাজের মাধ্যমে। সত্য ও তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ, মানুষের অধিকার ও জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা, ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করার সাহস এবং ভুল হলে তা সংশোধনের নৈতিকতা—এসবই একজন সাংবাদিকের আসল পরিচয়।
আজকের আরেকটি বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত অনেক পেশাজীবী নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতেও অস্বস্তি বোধ করছেন। কারণ সাংবাদিকতার পরিচয় যখন নানা বিতর্ক, রাজনৈতিক ট্যাগ, সংগঠনগত দ্বন্দ্ব ও অনিয়মের সঙ্গে মিশে যায়, তখন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও পেশাদার সাংবাদিকরাও বিব্রত হন। এটি কোনোভাবেই সুস্থ সাংবাদিকতার লক্ষণ নয়।
সাংবাদিকদের এই বিভাজনের আরেকটি বড় ক্ষতি হচ্ছে—নির্যাতনের সময় একজন সাংবাদিক একা হয়ে যাচ্ছেন। কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে তার পেশাগত পরিচয়ের চেয়ে আগে দেখা হচ্ছে তিনি কোন সংগঠনের, কোন গ্রুপের, কোন রাজনৈতিক মতের বা কার ঘনিষ্ঠ। অথচ সাংবাদিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত—তিনি একজন সাংবাদিক। অন্যায়ের শিকার সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানো মানে তার ব্যক্তিগত মতাদর্শকে সমর্থন করা নয়; বরং সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে রক্ষা করা।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF) এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, হুমকি ও পেশাগত চাপের বিভিন্ন ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। এসব প্রতিবেদন সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষও নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। দ্রব্যমূল্যের চাপ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয়—এসব বাস্তব সমস্যা নিয়ে জনগণ নির্ভরযোগ্য তথ্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রত্যাশা করে। এই সময়ে সাংবাদিকদের কাজ আরও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। কিন্তু সাংবাদিক সমাজ যদি নিজেদের মধ্যকার বিভাজনেই ব্যস্ত থাকে, তাহলে জনস্বার্থের সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক।
তাই এখন সময় এসেছে সাংবাদিক সমাজের আত্মসমালোচনার।
আমাদের ভাবতে হবে—আর কত সংগঠন দরকার? আর কত কমিটি দরকার? আর কত পদ-পদবি দরকার? বরং দরকার এমন একটি পেশাগত পরিবেশ, যেখানে একজন সাংবাদিক তার যোগ্যতা ও কাজের মাধ্যমে মূল্যায়িত হবেন। দরকার সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, নৈতিক আচরণবিধি, স্বচ্ছ সদস্যপদ এবং জবাবদিহিমূলক সংগঠন।
প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে ব্যক্তিগত প্রভাব, পদ-পদবি কিংবা নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার কেন্দ্র না বানিয়ে সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনের সংখ্যা নয়, সংগঠনের কার্যকারিতাই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি প্রতারণা, চাঁদাবাজি, হয়রানি বা অন্য কোনো অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন, তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা হওয়া উচিত। কারণ প্রকৃত সাংবাদিকের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে সাংবাদিকতার পরিচয়ের অপব্যবহারও বন্ধ করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—সাংবাদিকতা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষমতার হাতিয়ার নয় এবং কোনো সংগঠনের পদ-পদবির সিঁড়িও নয়। সাংবাদিকতা জনগণের জানার অধিকার রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা।
সাংবাদিকদের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকবে, সংগঠনের পার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক চিন্তার পার্থক্যও থাকতে পারে। কিন্তু সত্যের প্রশ্নে, সাংবাদিকের নিরাপত্তার প্রশ্নে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিভাজন কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আজ তাই সময় এসেছে একটি কঠিন সত্য স্বীকার করার—দেশে সাংবাদিক বেড়েছে, সম্পাদক বেড়েছে, সংগঠন বেড়েছে; কিন্তু সাংবাদিকতার মান কি একই হারে বেড়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সাংবাদিকদেরই। কারণ সাংবাদিকতার সংকট শুধু বাইরের চাপ থেকে তৈরি হয় না; কখনো কখনো সংকট তৈরি হয় আমাদের নিজেদের ভেতর থেকেও।
সাংবাদিকদের ঐক্য মানে সবাই একই মতের হবে—তা নয়। সাংবাদিকদের ঐক্য মানে হলো, মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও সত্য, নৈতিকতা, পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের প্রশ্নে সবাই একটি ন্যূনতম নীতিতে একমত হওয়া।
সংগঠন যতই বাড়ুক, যদি পেশাগত নৈতিকতা না বাড়ে—তাহলে সাংবাদিকতা শক্তিশালী হবে না। পদ যতই বাড়ুক, যদি দায়িত্ববোধ না বাড়ে—তাহলে সাংবাদিকতার মর্যাদা বাড়বে না। আর সাংবাদিক যতই বাড়ুক, যদি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা না বাড়ে—তাহলে গণমাধ্যমের শক্তি বাড়বে না।
এখন সময় সংখ্যার প্রতিযোগিতা বন্ধ করে মানের প্রতিযোগিতা শুরু করার। সাংবাদিকের পরিচয়কে পদবি দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার। আর সাংবাদিক সমাজকে বিভক্ত করার বদলে এমন একটি পেশাগত ঐক্য গড়ে তোলার—যেখানে একজন সাংবাদিক আক্রান্ত হলে তিনি একা থাকবেন না, বরং পুরো সাংবাদিক সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে।
কারণ সাংবাদিকতা বাঁচলে সত্যের কণ্ঠ বাঁচবে, আর সত্যের কণ্ঠ বাঁচলেই জনগণের জানার অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।

লেখক ও গবেষক:

আওরঙ্গজেব কামাল

সভাপতি : আন্তর্জাতিক প্রেসক্লাব ও ঢাকা প্রেসক্লাব


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর