ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। বিভিন্ন সময় গুঞ্জন ওঠে তিনি ভারত ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। তবে শেখ হাসিনা যে ভারতেই আছেন সেটি নিশ্চিত করলেও তার অবস্থান সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি মোদি সরকার। অবশেষে ভারতীয় গণমাধ্যম ‘দ্য প্রিন্ট’ শেখ হাসিনার অবস্থান নিশ্চিত করে সংবাদ প্রকাশ করেছে। বৃহস্পতিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত দুই মাস ধরে নয়াদিল্লির লুটিয়েনস বাংলো জোনের একটি সেইফ হাউসে বসবাস করছেন। সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, লুটিয়েন্স বাংলো এলাকাটিতে ভারতের মন্ত্রী, সিনিয়র এমপি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দকৃত বাড়ির মতো একটিতে শেখ হাসিনাকে থাকতে দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রোটোকলসহ মাঝে মাঝে দিল্লির লোধি গার্ডেনে হাঁটাহাঁটি করেন। তার জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। পলাতক হাসিনার গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার রক্ষার স্বার্থে দ্য প্রিন্ট বাড়িটির প্রকৃত ঠিকানা বা রাস্তার বিবরণ প্রকাশ করেনি।এদিকে, জুলাই-আগস্টে গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে গত সপ্তাহে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ১৮ নভেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে হাজিরের নির্দেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট একটি বিমানে করে ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছান শেখ হাসিনা ও তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ। বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছানোর পরপরই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও দেশটির উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর দুদিন পর তাকে হিন্দন বিমান ঘাঁটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। দ্বিতীয় একটি সূত্র বলেছে, ‘‘তিনি বেশিদিন বিমানঘাঁটিতে থাকতে পারতেন না। সেখানে থাকার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
যে কারণে তাকে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে একটি নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে দিল্লির নিরাপদ এবং সুরক্ষিত এলাকা লুটিয়েনসের একটি বাড়িতে তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়।দিও ভারতের সরকার শেখ হাসিনার অবস্থানের বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের কাছে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত আগস্টে সংসদে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা সংক্ষিপ্ত সময়ের নোটিশে ভারতে আসার অনুমতি চেয়েছিলেন।এই বিষয়ে জানতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে টেলিফোন কল ও ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছে দ্য প্রিন্ট। তবে বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের কোনও প্রতিক্রিয়া পায়নি ভারতীয় এই সংবাদমাধ্যম।শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক। বর্তমানে সংস্থাটির দিল্লি সদরদপ্তরে কর্মরত রয়েছেন তিনি। সায়মা ওয়াজেদ প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ডব্লিউএইচওর এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১০ সালে শেখ হাসিনার প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) জুলাই ও আগস্টে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় সংঘটিত ‘‘মানবতাবিরোধী’’ অপরাধের অভিযোগে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী-সহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও অন্য ৪৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। শেখ হাসিনাসহ অন্য রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে এই পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার। আদালতের কৌঁসুলিদের দায়ের করা দুটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই আদেশ জারি করা হয়।গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার ৬০টির বেশি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষকে ৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করে আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।