দীর্ঘ ১৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তিনি শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়া উদ্যানের মাজার প্রাঙ্গণে পৌঁছে পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মাজারে পৌঁছে প্রথমেই তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা এবং ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে নিহত শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন। এরপর বাবা শহীদ জিয়াউর রহমানের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে মোনাজাতে অংশ নেন। কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে সূরা ফাতিহা পাঠ করেন তিনি।এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।দলীয় সূত্র জানায়, এর আগে ২০০৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে শহীদ জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন তারেক রহমান। দীর্ঘ নির্বাসন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এরপর আর এই স্থানে আসা সম্ভব হয়নি তার। ফলে এবারের জিয়ারত বিএনপির রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও আবেগঘন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই শেরেবাংলা নগর ও জিয়া উদ্যানসংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক জনসমাগম লক্ষ্য করা যায়। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের হাজারো নেতা-কর্মী ব্যানার, ফেস্টুন ও দলীয় পতাকা হাতে জড়ো হন। বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা— ‘এক জিয়া লোকান্তরে, লক্ষ জিয়া ঘরে ঘরে’,‘আজকের এই দিনে, জিয়া তোমায় মনে পড়ে’,‘তারেক রহমান বীরের বেশে, আসছে ফিরে বাংলাদেশে’— এমন স্লোগানে আবেগ প্রকাশ করেন উপস্থিত কর্মীরা।নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাজার এলাকা ও আশপাশের সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্রবেশপথগুলোতে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি। দলীয় স্বেচ্ছাসেবকরাও শৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এর আগে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে গুলশানের বাসভবন থেকে শহীদ জিয়ার কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন তারেক রহমান। তিনি লাল-সবুজ রঙে সজ্জিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা বিশেষ নিরাপত্তাবেষ্টিত একটি বাসে করে যাত্রা করেন। গত দিনের মতো আজও বাসের সামনের অংশে দাঁড়িয়ে তিনি নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। উল্লেখ্য, আগের দিন বৃহস্পতিবার একই বাসে করে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। শুক্রবার দুপুরে জিয়া মাজার প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবার গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এগিয়ে যাবে। তার প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।তিনি আরও বলেন,তারেক রহমানের হাত ধরেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রত্যাশা করছে জনগণ। তার এই প্রত্যাবর্তন সেই আশার প্রতিফলন।
মাজার জিয়ারতকে কেন্দ্র করে নেতা-কর্মীদের মধ্যে আবেগের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রত্যাশাও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। অনেকেই বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, বেগম খালেদা জিয়া সেই ধারা এগিয়ে নিয়েছেন, আর তারেক রহমানের নেতৃত্বেই সেই রাজনীতি নতুন করে বিকশিত হবে।নেতা-কর্মীদের মতে, এটি কেবল একটি ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং বিএনপির জন্য একটি প্রতীকী ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা বহন করে।মাজার জিয়ারত শেষে বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে তারেক রহমান সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কর্মসূচি রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।এর আগে বৃহস্পতিবার লন্ডন থেকে বাংলাদেশ বিমানের বিজি-২০২ ফ্লাইটে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। সিলেট হয়ে বেলা ১১টা ৪৩ মিনিটে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও একমাত্র কন্যা জাইমা রহমান। বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের সংবর্ধনা মঞ্চে যেতে স্বাভাবিক সময়ে যেখানে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে, সেখানে সেদিন জনসমাগমের কারণে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগে।রাস্তার দুই পাশে নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই শুধু এক নজর দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন দীর্ঘ সময় ধরে। পুরো সাড়ে ছয় কিলোমিটার পথজুড়েই ছিল মানুষের ঢল।