আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও সোমবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনে রাস্তায় নেমেছিলেন । সরকারও তাদের দাবী মানলেও কেন ঘরে ফিরছেন না তার এবিষয় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। সোমবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, ঠাকুরগাঁও, নোয়াখালীসহ কয়েক জেলার কিছু স্থানে বিক্ষোভ করেছেন তারা। কোথাও তারা বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেননি। পুলিশের তাড়া খেয়ে স্থান ত্যাগ করেন তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এদিনও কর্মসূচিস্থল থেকে শিক্ষার্থীদের আটক করেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় ২০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। সোমবার (২৯ জুলাই) মিরপুর ১০ ও ধানমন্ডির স্টার কাবাবের সামনে থেকে তাদের আটক করা হয়।প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বেলা ১১টার পর থেকে বিক্ষোভকারীরা পল্টন, মিরপুর-১০, ইসিবি চত্বর ও ধানমন্ডির স্টার কাবাবের সামনে জড়ো হতে থাকেন। এ সময় পল্টন ও ইসিবি চত্বরে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ।দায়িত্বরত পুলিশের সদস্যরা বলেন, গলির ভেতর থেকে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল ছুড়ছিল। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিয়েছে। এ সময় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।এ বিষয়ে মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুন্সি সাব্বির গণমাধ্যমকে বলেন, বিক্ষোভ কর্মসূচির সময় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে অন্তত ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। নিউমার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার মো. রেফাতুল ইসলাম বলেন, ধানমন্ডির স্টার কাবাবের সামনে থেকে ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। এদিকে লক্ষ্মীপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। বিকেল ৩টায় আট দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শহরের ঝুমুর ও মাদাম ব্রিজ এলাকায় ঘণ্টাব্যাপী সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন তারা।এ সময় নানা স্লোগানে মুখরিত থাকতে দেখা গেছে আন্দোলনকারীদের। পরে তারা ঢাকা-রায়পুর সড়কে অবস্থান নিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেন।এ সময় নাফিস আহম্মদ ইকরাম নামে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রের ব্যাগ তল্লাশি করে হাতুড়ি পাওয়ায় তাকে আটক করে পুলিশ। এ ছাড়া নাশকতা এড়াতে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে এ সময় কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছে। ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ব্যানারে রাজনীতি করেন এমন শিক্ষার্থীরা লাঠি, রড, পাইপ নিয়ে এই হামলা চালান। আহতদের মধ্যে ৯ জনকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বরিশাল শাখার সমন্বয়ক সুজয় শুভ বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের পক্ষে গত শনিবার সংবাদ সম্মেলন করেন তারা। কিন্তু কিছু পত্রিকায় উল্টো সংবাদ আসে। এ নিয়ে পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা করতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এ কে আরাফাতের নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জন লাঠিসোঁটা নিয়ে অতর্কিতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা বেধড়ক পিটিয়ে অন্তত ১৫ জনকে আহত করে।তিনি বলেন, আহতদের মধ্যে মাহামুদুল হাসান, সুজন মাহামুদ, শর্মিলা জাহান ও সিরাজুল ইসলামের আঘাত কিছুটা গুরুতর। বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহমান জানান, হামলার খবর শুনে তারা উপস্থিত হয়ে ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনেন। যত দূর শুনেছেন, আন্দোলনের পক্ষের ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ ছাত্রদের হাতাহাতিতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। এদিকে নয় দফা দাবি আদায়ে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সোমবার বেলা ১১টার পর থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইনগেটের আশপাশের এলাকায় জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের এমন কর্মসূচির খবর পেয়ে পূর্ব থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেট ও মেইন গেট এলাকায় সাজোয়া যান নিয়ে অবস্থান নেন পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এরপর দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন শিক্ষকবৃন্দ। প্রধান ফটকে কিছুক্ষণ বিক্ষোভের পর শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারে গিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ তাদের কর্মসূচি শেষ করেন। ময়মনসিংহে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচিকে ঘিরে সকাল থেকেই নগরীতে কঠোর অবস্থানে ছিল র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা। এ কারণে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল করতে না পারলেও পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যেই সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে কর্মসূচি পালন করেন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নগরীর গাঙ্গিনাপাড় ট্রাফিক মোড়ে এ সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের ঘিরে থাকতে দেখা গেছে পুলিশ সদস্যদের।সমাবেশে আন্দোলনের সমন্বয়করা বলেন, ৯ দফা দাবিতে আমাদের আন্দোলন চলবে। ঢাকা থেকে যে কর্মসূচি দেওয়া হবে আমরা তা যথাযথভাবে পালন করব। এতে যত বাধাই আসুক, শত বাধা উপেক্ষা করেই শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে মাঠে থাকবে। আমাদের ৯ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। সেই সঙ্গে ময়মনসিংহ নগরীর মিন্টু কলেজ সংলগ্ন যে স্থানটিতে আমাদের ভাই রোদোয়ান হোসেন সাগর নিহত হয়েছেন, আমরা ওই স্থানটিকে ‘শহীদ সাগর চত্বর’ ঘোষণার দাবি করছি।সমাবেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. আশিকুর রহমান, আরিফুল ইসলাম, রাকিবসহ আরও অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।