শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২১ অপরাহ্ন
শিরোনাম
শিরোনাম
সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ থাকলে অনেক সমস্যা দূর হয়ে যায় : স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ড. মঈন খান দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুদককে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মাননীয়’ সম্বোধন পরিহারের সিদ্ধান্ত নিজের দপ্তর থেকেই বাস্তবায়ন শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা ও অবক্ষয়মূলক কনটেন্ট প্রতিরোধই সরকারের লক্ষ্য: তথ্যমন্ত্রী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান রাষ্ট্রপতির কৃষকদের ৫ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পানির পাম্প দেওয়া হবে : প্রধানমন্ত্রী শিবগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে  মোবাইল চুরি, আনসারের তৎপরতায় ফোন উদ্ধার—যুবক আটক ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৩ মাসের বিশেষ অভিযান, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে পানি বণ্টনসহ অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

জুলাই ৩৬—ছাত্র আমি: রক্ত, সাহস ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

আনিস প্রধান, বিশেষ প্রতিনিধি : / ২০ টাইম ভিউ
আপডেট : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২১ অপরাহ্ন

দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জমেছিল হতাশা, ভয় ও অনিশ্চয়তা। রাষ্ট্রক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্ব, বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সাধারণ মানুষের নানা সংকট—সব মিলিয়ে একটি সময় যেন জাতির সামনে সম্ভাবনার দরজা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছিল।
একটি স্বাধীন দেশের মানুষ যখন কথা বলতে ভয় পায়, তখন শুধু রাজনীতি নয়—সমাজের প্রতিটি স্তরেই তার প্রভাব পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন, মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার ও নানা রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ জনমনে ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় ইতিহাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে বিভিন্ন মহলে।
এরই মধ্যে বেড়ে উঠছিল নতুন এক প্রজন্ম। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে অভ্যস্ত এই প্রজন্মকে নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগের শেষ নেই। অনেকেই মনে করতেন, বাস্তব জীবনের সংগ্রাম ও সামাজিক দায়িত্ব থেকে তরুণরা ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকেই তার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে। শুরুতে এটি ছিল শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার ও কোটা সংস্কারের দাবি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, প্রাণহানি এবং দমন-পীড়নের অভিযোগ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে তোলে।
যে তরুণদের নিয়ে বলা হতো—তারা মাঠে খেলতে চায় না, বই পড়তে চায় না, সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত—তারাই একসময় রাজপথে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে নিজেদের শক্তি জানান দিল।
তাদের একটি অংশ ভয়কে জয় করল।
একজন পড়ে গেলে আরেকজন সামনে এগিয়ে এল। গুলি, টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ ও নানা বাধার মধ্যেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। বরং প্রতিটি আঘাত আন্দোলনের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছে।
শুরুতে অনেক অভিভাবক সন্তানদের রাজপথে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে সন্তানের সাহস ও আত্মত্যাগ তাদেরও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ধীরে ধীরে পরিণত হয় বৃহত্তর গণআন্দোলনে।
আন্দোলনের এক পর্যায়ে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। সেনাবাহিনী মোতায়েনের ঘটনাও ঘটে। তখন সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়—সবকিছু কি আবার থেমে যাবে?
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
শিক্ষার্থীদের প্রতি নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশের নমনীয় অবস্থান, জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সম্পৃক্ততা আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়। রাজপথে সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ব গণজোয়ার।
অবশেষে ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।
কেউ এটিকে গণঅভ্যুত্থান বলেন, কেউ বলেন ছাত্র-জনতার আন্দোলন; কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই—এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম।
কিন্তু বিজয়ের পর প্রশ্নও কম নয়
একটি সরকার বা একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের পতনই কি একটি দেশের সব সমস্যার সমাধান?
সম্ভবত নয়।
কারণ ইতিহাস বলে, একটি স্বৈরাচারী বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতনের পরও তার রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ও স্বার্থের কাঠামো দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে।
তাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জুলাইয়ের আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেই বাংলাদেশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
যে তরুণরা রক্ত দিয়েছে, তারা কি কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ পেয়েছে?
যারা আন্দোলনের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের কেউ কেউ যদি পরবর্তীতে ক্ষমতা ও অর্থের সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে—তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক।
একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও এখন বড় পরীক্ষা। ক্ষমতার পালাবদল যেন শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দুর্নীতি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার যদি নতুন মোড়কে ফিরে আসে, তাহলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্য কোথায়?
বিএনপি, জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক শক্তির জন্যই সময় এসেছে নিজেদের ভেতরের দুর্বলতা ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করার। কারণ ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে—বাইরের শত্রুর চেয়ে ভেতরের বিভাজনই একটি আন্দোলন বা রাজনৈতিক অর্জনকে দুর্বল করে দেয়।
‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’—এমন স্লোগান কেন?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে নানা ধরনের পোস্ট ও প্রচারণা এখনও দেখা যায়। এসব প্রচারণাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার আগে রাজনৈতিক বাস্তবতা, জনগণের মনোভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্ত ভিত—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে স্থায়ীভাবে পরাজিত করতে হলে শুধু ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আস্থা অর্জন।
অন্যথায় ইতিহাসের পুরোনো চরিত্রগুলো নতুন পোশাকে আবার ফিরে আসতে পারে।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
জুলাই আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে—তরুণ সমাজকে কখনো দুর্বল করে দেখার সুযোগ নেই।
যে প্রজন্মকে আমরা মোবাইল-আসক্ত, অস্থির কিংবা দায়িত্বহীন বলে সমালোচনা করতাম, সেই প্রজন্মই প্রয়োজনে বুক পেতে রাজপথে দাঁড়িয়েছে।
তাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পরিবর্তন যদি আবারও দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা দলীয় স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের প্রতি প্রকৃত সম্মান হবে—একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।
আজ তাই প্রশ্ন একটাই—
জুলাই কি শুধু একটি সরকারের পতনের নাম, নাকি একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা?
উত্তরটি নির্ভর করছে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি জনগণের ওপর।
জুলাইয়ের রক্ত যেন বৃথা না যায়।
ছাত্রদের সাহস যেন ক্ষমতার সিঁড়ি না হয়ে জাতির ভবিষ্যতের ভিত্তি হয়।
আর নতুন বাংলাদেশ যেন আবার কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে বন্দি না হয়—এটাই হোক জুলাই ৩৬-এর সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর