বইয়ের ওপর বর্বরোচিত হামলা, বইয়ের স্টল ভাঙচুর এবং বই পদদলিত করার ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতায় বিশাল প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর বিকেল ৩টায় কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগরের মূর্তির সামনে থেকে বইপ্রেমী মানুষের আহ্বানে এই প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয়। কয়েক হাজার কবি, সাহিত্যিক, প্রকাশক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ বইপ্রেমী মানুষ হাতে হাতে বই নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দঘন পরিবেশে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে বইয়ের স্টল ভাঙচুর, বই ছুড়ে ফেলা ও পায়ের নিচে পদদলিত করার অভিযোগে ক্ষোভে ফেটে পড়েন কবি-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের উপস্থিতিতে এবং কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্টদের সামনে এমন ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে যাদবপুরের একটি বইয়ের স্টলে বইয়ের ওপর আক্রমণ ও লাথি মেরে বই ফেলে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ এবং বই, প্রকাশনা ও স্বাধীন সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ রক্ষার দাবিতে প্রতিবাদে শামিল হন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিকর্মীরা।
মিছিলে উপস্থিত ছিলেন কমরেড বিমান বসু, কমরেড বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য, কমরেড সুজন চক্রবর্তী, কমরেড দেবাঞ্জন ও বর্ণনা, শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার, শমীক ভট্টাচার্য, সঞ্চারী সেন, রত্না মিত্র, ভগীরথ মিত্র, জিহাদ আলী, অন্বেষা সেনগুপ্ত, বিভাস চক্রবর্তী, জহর সরকার, শ্যামল সেনগুপ্ত, যশোধর রায়চৌধুরী, পৌলমী চট্টোপাধ্যায়, শুভময় মণ্ডল, বিষ্ণুপ্রিয়া বসাক, বরেন্দ্র মণ্ডল, কাজী কামাল নাসের, সুজিত দাস, সৌমিত্র বসু, শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য, দীপালী ভট্টাচার্য, কোয়েল ভড়, কঙ্কন সরকারসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি, লেখক-লেখিকা ও বইপ্রেমী মানুষ।
সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ও কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ মিছিলের সূচনা হয়। মিছিলটি বিদ্যাসাগরের মূর্তির সামনে থেকে শুরু হয়ে সিটি কলেজ, কলেজ স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী বইপাড়া পরিক্রমা করে পুনরায় বিদ্যাসাগরের মূর্তির সামনে এসে শেষ হয়। পরে প্রতিবাদী গান, কবিতা ও বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
মিছিলের অন্যতম আকর্ষণ ছিল একটি ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ আহ্বান— ‘বইয়ের জন্য হাঁটুন।’ হাতে বই নিয়ে মানুষের এই পদযাত্রা যেন স্পষ্ট বার্তা দিল, বই কেবল কাগজের পৃষ্ঠা নয়; বই মানুষের চিন্তা, মনন, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, এত বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বইয়ের ওপর এমন আক্রমণের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বই ও বইয়ের স্টলের ওপর যে ধরনের হামলার অভিযোগ উঠেছে, তা বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
তাঁরা আরও বলেন, দুর্গাপূজা বা শারদোৎসব শুধু আনন্দ-উৎসব নয়, বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতারও এক মিলনমেলা। প্রতিবছর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে বইয়ের স্টল, পত্রিকা প্রকাশনা, নাটক, গান, কবিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে। অথচ এবছর বইয়ের স্টল ভাঙচুর, বই ছুড়ে ফেলা এবং কর্মী-সংগঠকদের আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত লজ্জাজনক ও নিন্দনীয়।
বক্তাদের আশঙ্কা, এভাবে বই ও প্রকাশনার ওপর আক্রমণ চলতে থাকলে নতুন লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও প্রকাশনা জগৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষের বই পড়ার স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়বে।
তাঁরা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, বইয়ের ওপর আক্রমণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। বই পড়ার অধিকার, প্রকাশনার স্বাধীনতা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ রক্ষায় কবি, সাহিত্যিক, প্রকাশক ও সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন। নতুন বই প্রকাশিত হবে, মানুষ বই পড়বে এবং আগামী প্রজন্মের হাতে বই তুলে দেওয়ার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
এই প্রতিবাদ মিছিলের মধ্য দিয়ে আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন— বইয়ের ওপর আঘাত মানে জ্ঞান, মনন ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত। তাই বইকে বাঁচাতে, পাঠাভ্যাসকে এগিয়ে নিতে এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রতিবেদনে: সমরেশ রায় ও শম্পা দাস
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ।