শ্রমিক-মালিক এক হয়ে গড়বো এ দেশ নতুন করে' স্লোগানের মধ্য দিয়ে নানা কর্মসূচিতে সারা দেশে পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে শ্রমিক সমাবেশ ও শোভাযাত্রা বের হয়। কর্মসূচিতে শ্রমঘণ্টা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতের দাবি জানান শ্রমিকেরা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বিভিন্ন স্থানে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন মহান মে দিবস পালিত হয়েছে।শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক, নীতি, আদর্শ বজায় রেখে বাংলাদেশের কলকারখানায় উৎপাদন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করে রাজধানীতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করেছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘শ্রমিক-মালিক এক হয়ে, গড়বো এ দেশ নতুন করে মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস-২০২৫ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ৫ জন শ্রমিকের পরিবারের হাতে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেন।শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সুলতান উদ্দিন আহমেদ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ হাংবোর একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়।এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তর বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে।মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার শ্রমিক সমাবেশের আয়োজন করে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। রাজধানীর নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সামনের সড়কে অস্থায়ী মঞ্চে এই সমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন সভাপতিত্ব করেন। এদিকে মহান মে দিবস উপলক্ষে রাজধানীর পল্টন
মোড়ে শ্রমিক সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ন ম শামসুল ইসলাম সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।মহান মে দিবস উপলক্ষে ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর পূর্বের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় এক শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিন্সিপাল মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনের ঢাকা মহানগর পূর্বের সভাপতি মুহাম্মদ রমজান আলী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন।মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় পত্রিকাসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো দিবসটি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা ও টকশো সম্প্রচার করেছে।শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তর/সংস্থার মাঠ পর্যায়ের কার্যালয়সমূহ জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়। এদিকে দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কদ্বীপ ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন দিবসটি পালন করছে শোভাযাত্রা, শ্রমিক সমাবেশ, আলোচনা সভা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সংগঠন পৃথক কর্মসূচি পালন করে। উল্লেখ,১৮৮৬ সালের ১লা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমের মর্যাদা, শ্রমের মূল্য ও দৈনিক (সর্বোচ্চ) আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে শ্রমিকেরা যে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন—তাদের সেই আত্মত্যাগের সম্মানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে দিবসটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়।দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরে সকল গণমাধ্যম বিভিন্ন লেখা প্রকাশ ও অনুষ্ঠান প্রচার করছে। মহান মে দিবসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে জাতীয় ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়।দিবসটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। মালিক-শ্রমিক সম্পর্কে এই দিবসের তাৎপর্য ও প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এর ফলে শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় নেমে আসে আট ঘণ্টায়। সারা বিশ্বের শ্রমিকরা তাদের শ্রমের উপযুক্ত মর্যাদা পেতে শুরু করেন। তারা নিজেদের অধিকার আদায়ে সফল হন।বিশ্বের ইতিহাসে সংযোজিত হয় সামাজিক পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়। মে দিবসের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়, তার ফলে ধীরে ধীরে লোপ পেতে শুরু করে সামাজিক শ্রেণি-বৈষম্য। তবে শ্রেণি-বৈষম্য এখনও পুরোপুরি দূর না হলেও মে দিবসের সেই আত্মত্যাগ নিপীড়িত শ্রমজীবী মানুষকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে অনেকটাই মুক্ত করেছে।